সংখ্যা - ১ ৪ ৮ ৫ তারিখ - ০ ৬ . ০ ৮ . ২ ০ ২ ৬ বর্ষ - ৩০
সংখ্যা - ১ ৪ ৮ ৫ তারিখ - ০ ৬ . ০ ৮ . ২ ০ ২ ৬ বর্ষ - ৩০
সম্পাদকীয়
আগস্ট মাস। নাট্য ও ভারত- মঞ্চ এবং দেশ দুটি ক্ষেত্রে স্মৃতি উজ্বল। ২২ আগস্ট গ্রুপ থিয়েটার বা গত প্রায় আট দশক ধরে বাংলা নাট্য প্রবাহ তার সূচনা যাঁর হাত ধরে সেই বহুরূপীর শম্ভু মিত্র'র জন্ম মাস। ২২ আগস্ট তাঁর ১১১ তম জন্মদিন।
৯ আগস্ট 'ভারত ছাড়ো' দিবস। ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস।
অর্থাৎ থিয়েটার নিয়ে, দেশ নিয়ে গৌরব করবার, ফিরে দেখবার, ঐতিহাসিক প্রচলিত বয়ানগুলো নেড়ে চেড়ে দেখা, নতুন বয়ান গড়ে তোলার চেষ্টা সবই সম্ভব। যদি আমাদের ভেতরে তাগিদ জাগে।
মুশকিল হচ্ছে আমরাতো অনুষ্ঠান বুঝি।
যারা দর্শক তাদেরও আমরা অনুষ্ঠানের জন্য আনুষ্ঠানিক হিসেবেই মন প্রস্তুত করে দিয়েছি।
তাই যেমন রাজনীতিকরা পতাকা উত্তোলক ও ভাষণ অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। এবারও করা হবে নিশ্চয়ই ৯ এবং ১৫ তারিখে,
অবশ্য নাটকের আমরা নিজেদের নাট্যানুষ্ঠানে এতটাই ব্যস্ত, আমাদের মনে থাকবে কি ২২ আগস্ট?
অন্তত একটি দুটি দলের বাইরে আগের বছরগুলোতে আমরা খুব কিছু অনুষ্ঠানও দেখেছি বলে মনে পড়ছেনা। এইটা অবশ্য আমাদের ধারা, ধরণ।
-শিব মুখোপাধ্যায়
হওয়া না হওয়ার ‘ডাকঘর’: এক রবীন্দ্রনাটকের ইতিহাস
নাটকটা সকলেই চেনে। একজন অসুস্থ শিশু তার পিশেমশাইয়ের তত্ত্বাবধানে, কবিরাজের নির্দেশে একটা ঘরে বন্দী। অথচ সেই ঘরের জানলাই তাকে পৌঁছে দেয় অন্য এক দুনিয়ায়। ঘরের চার দেওয়াল তার কাছে আর বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। দইওয়ালা হোক বা সুধা, সকলের সঙ্গে ভাব জমে যায় ছোট্ট ছেলেটির। এতক্ষণে সকলেই বুঝে গেছেন নাটকের নাম। হ্যাঁ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘ডাকঘর’ নাটকের কথাই বলা হচ্ছে।
ডাকঘর নাটক হিসেবে কেন অনন্য, সেই কথা আমরা সকলেই জানি৷ কিন্তু ডাকঘরের অভিনয়ের ইতিহাসও যে বিচিত্র এবং কম অভিনব নয়, তা আমরা অনেকসময়ই ভুলে যাই। কী প্রবল মানবিক আবেদনে এই লেখা যুগের পর যুগ ধরে ছুঁয়ে গেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষকে, বাংলা নাটকের ইতিহাসে সেই আখ্যান কম বরণীয় নয়।
আধুনিক বাংলা সাহিত্য বিভিন্ন প্রখ্যাত নাটককারের বিচরণক্ষেত্র হয়ে থেকেছে। কিন্তু যদি বলি ডাকঘর এমন এক নাটক, যা বাংলায় অভিনীত হওয়ার বেশ কিছু বছর আগেই ইংরাজিতে মঞ্চস্থ হয়েছিল সুদূর আয়ারল্যান্ডের এক প্রেক্ষাগৃহে, - তাহলে কিন্তু বেশ অবাক হতে হয়। সেই ইতিহাসের পিছনে কাণ্ডারী ছিলেন ডাব্লিউ বি. ইয়েটস৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তির ইতিবৃত্তে যে ইয়েটস সাহেবের কথা আমরা বারবার আলোচনা করি, ডাকঘরের প্রথম অভিনয়ের কারিগরও তিনি। আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের অ্যাবি থিয়েটারে ১৯১৩ সালে মঞ্চস্থ হয় ডাকঘরের ইংরাজি অনুবাদ ‘দ্য পোস্ট অফিস’। অনুবাদ করেছিলেন অক্সফোর্ডের কৃতি ছাত্র দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। ইয়েটস এর সঙ্গে লেডি গ্রেগরিও ছিলেন এই নাট্যপ্রযোজনার বিশেষ সহযোগী। ওই বছরেই শেষের দিকে লন্ডনের কোর্ট থিয়েটারে অভিনীত হতে থাকে এই নাট্যের প্রযোজনা। এক বাংলা নাটক সাড়া ফেলে দেয় পশ্চিমি নাট্যচর্চার প্রাণকেন্দ্রে। পরের বছর দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদ বই আকারে প্রকাশিত হয় লন্ডনে। প্রথমে মাত্র ৪০০ কপি প্রকাশিত হয়েছিল সেই বই, ইয়েটস স্বয়ং লিখেছিলেন সেই বইয়ের ইংরাজি সংস্করণের ভূমিকা। ভুললে চলবে না, এই সেই বছর যখন ইংল্যান্ড সফর সেরে দেশে ফিরেছেন কবি এবং তারপরে নভেম্বর মাসে শান্তিনিকেতনে বসে তিনি জানতে পেরেছেন তাঁর নোবেলপ্রাপ্তির খবর।
তবে ডাকঘরের ৪০০ কপি দিয়ে ইউরোপের সাহিত্যমহলে আত্মপ্রকাশ তো কেবল এক অবিস্মরণীয় ইতিহাসের শুরুর কথা৷ শীঘ্রই ডাকঘর সাড়া ফেলে দেয় জার্মানীতেও। বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তখনও ইউরোপের দেশগুলি যুযুধান পক্ষে ভেঙে যায়নি। যদিও সবদিক থেকেই চাপা রাজনৈতিক উত্তেজনার উত্তাপ টের পাচ্ছে সব দেশই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই নাটক সেই সময় থেকেই ছড়িয়ে যেতে শুরু করে পশ্চিম ও পূর্ব ইউরোপের নানাপ্রান্তে। অবশ্য শুধু ডাকঘর নয়, সেইসঙ্গে কবির আরেক নাটক ‘রাজা’ও সমাদর পেতে শুরু করে ইউরোপের নানাপ্রান্তে।
বঙ্গদেশে ডাকঘরের প্রথম অভিনয় হয়েছিল অনেক পরে ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখন তার চূড়ান্ত পর্যায়ের বীভৎসতায় স্তব্ধ করে দিয়েছে পৃথিবীকে। পৃথিবীর সেই গভীরতর অসুখের দিনে রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে প্রথমবারের জন্য বাংলায় অভিনীত হয় ডাকঘর। কোনো মঞ্চে নয়, ‘বিচিত্রা’র দোতলার ঘরে। স্পেস-স্পেসিফিক থিয়েটারের রমরমা শুরু হওয়ার অনেক আগেই ডাকঘর অভিনয়ের জন্য একটা বাড়ির ঘরকে বেছে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই নাটকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথও। আর ছোট অমলের ভূমিকায় ছিল আশ্রমেরই ছাত্র আশামুকুল।
সত্যি সত্যিই সময় যত এগিয়েছে ডাকঘর কিন্তু আশার মুকুল হয়ে উঠেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে৷ এক বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে যে নাটককে প্রথমবার আবিষ্কার করেছিল ইউরোপ, দ্বিতীয়বার বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার মুখোমুখি হয়ে সেই নাটকই হয়ে উঠল অসহায় মানুষের আশার ভাষ্য। তাই নাৎসি জার্মানীর সেনা যখন আক্রমণ করল ফ্রান্স, তখন ফরাসি সাহিত্যিক আঁদ্রে জিদ অনুবাদ করলেন ডাকঘর৷ সেই নাটক পড়া হল ১৯৪০ সালের জুন মাসে ফরাসি বেতারে। জিদ নিজেও পরবর্তীকালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন বিশ্বযুদ্ধ শেষের দুইবছর পর, ১৯৪৭ সালে।
আরো একজন নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক স্পেনীয় ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন ডাকঘর। জুয়ান র্যামোথ জিমেনেজ এর কলমে ডাকঘর ছড়িয়ে পড়েছিল স্পেনীয় পাঠকসমাজেও।
তবে এতো কেবল অনুবাদের ইতিহাস। বিশ্বযুদ্ধের দিনগুলোতে ডাকঘর অভিনয়ের ইতিহাস মর্মান্তিক অথচ চমকপ্রদ। লোকস্মৃতি অনুযায়ী জার্মানীর কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে বিষাক্ত গ্যাসের ধোঁয়ায় মৃত্যুর অপেক্ষা করতে করতে ডাকঘর অভিনয় করে নিজেদের সুস্থ রাখার চেষ্টা করতেন বন্দীরা। কেমন হতো সে অভিনয়, তার তথ্য সুলভ নয়। অনেক অভিনেতা হয়তো মারা গেছেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পেই। তবু যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাদের অনেকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল ডাকঘর। আর নাৎসি অধ্যুষিত পোল্যান্ডের ওয়ারশ ঘেটোতে তো ডাকঘরের অভিনয় হয়েছিল পোলিশ ভাষায়। যার তত্ত্বাবধানে ছিলেন পোলিশ ইহুদি জানুস কোরজাক। কোরজাক ছিলেন শিশুসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ। নাৎসি বাহিনীর হাতে তাঁর মৃত্যু হয় ত্রেব্লিঙ্কা কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে। তবুও অমল নামে এক শিশুর গল্প বাঁচিয়ে রেখেছিল তার নিশ্চিত মৃত্যুপথযাত্রী জীবনকে। অনেকটা জীবনী শক্তি ঢেলে দিলেও একটা নাটক সবসময় জীবনদাতা তো হয়ে উঠতে পারে না। ডাকঘরের সেসব অভিনয়ের অনেক মুখই তাই আর কখনো বেরোতে পারেননি কনসেনট্রেশান ক্যাম্পের অন্ধকারের বাইরে।
ডাকঘরের ইতিহাস আসলে বিচিত্র, বহুমুখী। সভ্যতার ইতিহাসের মতোই সেখানে প্রসারের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গেই লেগে থাকে বিয়োগের বেদনা। আর সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন একজন মানুষ, যাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ। শুধু ভারতীয় বা বাঙালিকে নয়। তীব্র গাঢ় অন্ধকারেও তাঁর নাটক মানুষকে অপেক্ষা করতে শিখিয়েছে এক অলৌকিক রাজার চিঠির জন্য। ২২ শ্রাবণ আসন্ন আবারও। আকাশ কালো করে বর্ষণও অবিরাম৷ সেই ধারা শুদ্ধ করবে ধরণী। রাজকবিরাজ ঠিক আসবেন কোনো এক সময়ে, তারপর সব অসুখ সারবে, সেই অপেক্ষায় আমরাও কি বসে নেই আজ এই উত্তর আধুনিক এ.আই সর্বস্ব একুশ শতকীয় পৃথিবীতে?
-সৌরদীপ মুখোপাধ্যায়
Advertisement
হাওড়া সদর কেন্দ্রে - পশ্চিমবঙ্গ নাট্য পরিষদের প্রথম অধিবেশন
গত ২ আগষ্ট ব্যাতাইতলা শোভাশুভ ভবনে গঠিত হলো হাওড়া সদর লোকসভা কেন্দ্রের পশ্চিমবঙ্গ নাট্য পরিষদ, এবং পরিষদের প্রথম অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন নাট্য পরিষদের উপদেষ্টা মন্ডলীর দুই সদস্য পার্থপ্রতিম দেব ও ড. সুকমল মৈত্র, উপস্থিত ছিলেন উলুবেড়িয়া লোকসভা কেন্দ্রের আহ্বায়ক সুমিত পাড়ুই। প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন নাট্যকর্মী, নির্দেশক ছাড়াও আরো বিশিষ্ট নাট্য জন ও বিভিন্ন শিল্প মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা এই অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গ নাট্য পরিষদ নির্বাচিত হাওড়া সদর লোকসভা কেন্দ্রের আহ্বায়ক অজয় সাউ জানালেন এই উদ্যোগের ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা, দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে শুধুমাত্র নাট্য শিল্পের উন্নতি প্রসারই লক্ষ্য। সুমিত পাড়ুই বলেন নাটককে শুধুমাত্র কলকাতা কেন্দ্রিক না করে জেলার প্রতিভাবানদেরও তুলে আনতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ নাট্য পরিষদের উপদেষ্টা পার্থপ্রতিম দেব এবং ডঃ সুকোমল মৈত্র, জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী সমস্ত নাট্যকর্মীকে এক জায়গায় জড়ো হবার কথা বলেন। দরকারে নাটকের স্বার্থে দলমত নির্বিশেষে সমবেতভাবে নাট্যকর্মীদের সুযোগ সুবিধার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হবে। জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী সব নাট্যকর্মীর মিলন মঞ্চ পশ্চিমবঙ্গ নাট্য পরিষদ। এই অধিবেশন থেকে পার্থপ্রতিম দেব হাওড়া জেলার আহ্বায়কদের আরো বেশি করে কাজ করার উপর জোর দিতে বলেন। ড. সুকোমল মৈত্র বলেন, "এখনো যারা বাইরে রয়েছেন তাদের কাছে অনুরোধ করব আপনারা আসুন। আমরা সবাই এক ছাতার তলায় এসে আমাদের এই সংগঠনকে মজবুত করি।" সবশেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন হাওড়ার আহ্বায়ক অজয় সাউ। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন লক্ষ্মী রূপা ব্যানার্জি।
এনএসডি -তে নতুন নাট্য: শ্রীমান চোর
জাতীয় নাট্য বিদ্যালয়ের (এনএসডি) দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিখ্যাত ইতালীয় নাট্যকার ও নোবেলজয়ী দারিও ফো-র বহুল প্রশংসিত নাটক Virtuous Burglar-এর হিন্দি রূপান্তর ‘শ্রীমান চোর??’ সফলভাবে মঞ্চস্থ করেছিলেন। প্রযোজনাটির রূপান্তর, সুরারোপ এবং নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ইশতিয়াক খান। তাঁর সৃজনশীল পরিকল্পনা ও অভিনব মঞ্চভাবনার মাধ্যমে নাটকটি এক অনন্য মাত্রা লাভ করেছিল এবং দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছিল।
নাটকটির কাহিনি ব্যঙ্গ, তীক্ষ্ণ রসবোধ এবং সমাজ-বাস্তবতার সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল। মঞ্চে শিল্পীদের প্রাণবন্ত অভিনয়, সংলাপ পরিবেশনের দক্ষতা, চরিত্র নির্মাণের গভীরতা এবং নিখুঁত দলগত সমন্বয় দর্শকদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আকৃষ্ট করে রেখেছিল। হাস্যরসের আবরণে সমাজের নানা অসঙ্গতি ও মানবজীবনের জটিল বাস্তবতাকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছিল, যা দর্শকদের যেমন আনন্দ দিয়েছিল, তেমনি ভাবতেও বাধ্য করেছিল।
নয়াদিল্লির অভিমঞ্চ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এই প্রযোজনাটি বিপুল সংখ্যক নাট্যপ্রেমীর উপস্থিতিতে মঞ্চস্থ হয়েছিল। নাটকটি শেষ হওয়ার পর দর্শকদের করতালি ও উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় অডিটোরিয়াম মুখরিত হয়ে উঠেছিল। উপস্থিত দর্শকরা শিক্ষার্থীদের অভিনয়, মঞ্চসজ্জা, সঙ্গীত পরিকল্পনা এবং সামগ্রিক উপস্থাপনাকে উচ্চ প্রশংসায় ভূষিত করেছিলেন। এই প্রযোজনার মাধ্যমে জাতীয় নাট্য বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা তাঁদের অভিনয় দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং পেশাদারিত্বের পরিচয় অত্যন্ত সফলভাবে তুলে ধরেছিলেন। ব্যঙ্গধর্মী নাট্যরীতির সফল প্রয়োগ এবং শক্তিশালী মঞ্চ উপস্থাপনার কারণে ‘শ্রীমান চোর??’ দর্শকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলেছিল এবং সমগ্র প্রযোজনাটি নাট্যপ্রেমীদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা ও উচ্ছ্বসিত সাড়া অর্জন করেছিল।
-স্নেহা বন্দ্যোপাধ্যায়
Advertisement
মঞ্চের স্মৃতি যখন দর্শকের ঘরে: নর্থ্যাম্পটনের উদ্যোগ কি ভারতীয় থিয়েটারের জন্য নতুন দিশা?
নাটক শেষ হয়ে যায় পর্দা নামার সঙ্গে সঙ্গে—এ কথা আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু সত্যিই কি একটি নাটকের জীবন সেদিনই শেষ হয়? মঞ্চে ব্যবহৃত একটি চেয়ার, একটি কস্টিউম, একটি মুখোশ, কিংবা অভিনেতার হাতে ধরা একটি ছড়ি—এসব কি শুধুই বস্তু? নাকি এগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকে একেকটি প্রযোজনার ইতিহাস, শিল্পীদের শ্রম, দর্শকের আবেগ এবং একটি সময়ের সাংস্কৃতিক স্মৃতি? ব্রিটেনের নর্থ্যাম্পটনের রয়্যাল এন্ড ডার্নগেট থিয়েটার সম্প্রতি এই প্রশ্নগুলির এক বাস্তব উত্তর তুলে ধরেছে এক অভিনব উদ্যোগের মাধ্যমে। তাদের আয়োজিত 'বিগ থিয়েটার সেল'-এ দর্শকদের জন্য বিক্রি করা হয় বহু প্রযোজনায় ব্যবহৃত আসল কস্টিউম, প্রপস, আসবাব, সেটের উপকরণ, পোস্টার এবং অন্যান্য নাট্যসামগ্রী। মুহূর্তের মধ্যেই অনুষ্ঠানটি শুধুমাত্র একটি বিক্রয় মেলা না থেকে রূপ নেয় নাট্যঐতিহ্যকে ঘিরে এক আবেগঘন উৎসবে।
দুই দিনের এই বিক্রয় অনুষ্ঠানে নাট্যপ্রেমীদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই সকাল থেকেই লাইনে দাঁড়ান, কারণ তাঁদের কাছে এই সামগ্রীগুলির বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এর স্মৃতিমূল্য। যে পোশাক একসময় আলো ঝলমলে মঞ্চে কোনও বিখ্যাত চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলেছিল, অথবা যে টেবিলকে কেন্দ্র করে নাটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যটি অভিনীত হয়েছিল, সেই জিনিস নিজের ঘরে নিয়ে যাওয়ার অনুভূতি যে কোনও থিয়েটারপ্রেমীর কাছে এক বিরল অভিজ্ঞতা। এ যেন একটি নাটকের ইতিহাসের ছোট্ট অংশকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের অংশ করে নেওয়া।
এই উদ্যোগের তাৎপর্য আরও গভীর, কারণ রয়্যাল এন্ড ডার্নগেট কোনও সাধারণ নাট্যগৃহ নয়। ১৮৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক রয়্যাল থিয়েটার এবং পরবর্তীকালে নির্মিত ডার্নগেট থিয়েটারকে মিলিয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান আজ ব্রিটেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক থিয়েটার। এখানে যেমন নতুন নাটক প্রযোজনা হয়, তেমনি রয়েছে সমৃদ্ধ আর্কাইভ, যেখানে সংরক্ষিত থাকে বিভিন্ন প্রযোজনার দলিল, পোস্টার, পোশাক এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন। বহু বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র নাটক মঞ্চস্থ করেই থেমে থাকেনি; বরং নাট্যঐতিহ্য সংরক্ষণকেও নিজেদের দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে থিয়েটারকে শুধু একটি পরিবেশনা হিসেবে নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা বাড়ছে। দর্শককে শুধুমাত্র টিকিট কিনে নাটক দেখার সুযোগ দেওয়া নয়, বরং নাটকের ইতিহাস, নির্মাণপ্রক্রিয়া এবং মঞ্চের অন্দরমহলের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। নর্থ্যাম্পটনের এই উদ্যোগ সেই ধারারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ব্যবহৃত প্রপস বা পোশাক বিক্রির মাধ্যমে একদিকে যেমন থিয়েটারের অতিরিক্ত আয় হয়, অন্যদিকে দর্শকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কও আরও গভীর হয়। একটি নাটক শেষ হওয়ার পরেও তার স্মৃতি নতুন রূপে বেঁচে থাকে দর্শকের ঘরে।
ভারতের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের দেশে, বিশেষত বাংলা গ্রুপ থিয়েটারে, প্রযোজনার পর ব্যবহৃত সেট, প্রপস, কস্টিউম কিংবা পোস্টারের ভবিষ্যৎ খুব কম ক্ষেত্রেই পরিকল্পিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থানাভাব, অর্থাভাব অথবা সংরক্ষণের অভাবে সেগুলি নষ্ট হয়ে যায় বা হারিয়ে যায়। অথচ এগুলিই ভবিষ্যতের নাট্যগবেষণার মূল্যবান উপাদান হতে পারত। একটি প্রজন্মের শিল্পচর্চার সাক্ষ্য হিসেবে এগুলির গুরুত্ব অপরিসীম।
বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে নানা নাট্যদলের অসংখ্য ঐতিহাসিক প্রযোজনা রয়েছে। সেইসব প্রযোজনার পোশাক, আলোক পরিকল্পনার স্কেচ, হাতে আঁকা সেট ডিজাইন, পোস্টার কিংবা প্রপস যদি আজ সুসংগঠিতভাবে সংরক্ষিত থাকত, তবে তা শুধু গবেষকদের জন্য নয়, সাধারণ দর্শকের কাছেও এক অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠত। অনেক দেশের মতো ভারতে নাট্যসংগ্রহশালা, চলমান প্রদর্শনী কিংবা প্রযোজনা-পরবর্তী স্মারক বিক্রির সংস্কৃতি এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
অবশ্য ব্যতিক্রমও রয়েছে। ভারতের কিছু জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যেমন জাতীয় নাট্য বিদ্যালয় বা কয়েকটি বড় সাংস্কৃতিক সংস্থা সীমিত পরিসরে আর্কাইভ সংরক্ষণের কাজ করে। কিন্তু রাজ্যভিত্তিক গ্রুপ থিয়েটারের বিশাল ভাণ্ডারের তুলনায় এই প্রচেষ্টা এখনও অপর্যাপ্ত। বিশেষ করে বাংলা থিয়েটারের মতো সমৃদ্ধ ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও কোনও কেন্দ্রীভূত নাট্য-আর্কাইভ বা দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত সংগ্রহশালার অভাব স্পষ্ট।
নর্থ্যাম্পটনের উদ্যোগ ভারতীয় থিয়েটারের কাছে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। মঞ্চসামগ্রীকে শুধুমাত্র ব্যবহারযোগ্য বস্তু হিসেবে না দেখে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে মূল্যায়ন করা জরুরি। নাটকের নির্দিষ্ট বার্ষিকী উপলক্ষে পুরনো কস্টিউম ও প্রপস প্রদর্শনী, সীমিত সংস্করণের স্মারক বিক্রি, পোস্টার পুনর্মুদ্রণ, অথবা ব্যবহৃত প্রপসের নিলাম—এই ধরনের উদ্যোগ দর্শকের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। পাশাপাশি এগুলি নাট্যদলের জন্য একটি বিকল্প আয়ের উৎসও হতে পারে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
আজ যখন ভারতীয় থিয়েটার ডিজিটাল মাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে এবং নতুন দর্শক আকর্ষণের নানা পথ খুঁজছে, তখন নর্থ্যাম্পটনের এই উদ্যোগ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। থিয়েটারের শক্তি কেবল মঞ্চে নয়, তার স্মৃতিতেও। সেই স্মৃতিকে যদি সযত্নে সংরক্ষণ করে দর্শকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়, তবে নাটক আর কয়েক ঘণ্টার একটি পরিবেশনা হয়ে থাকবে না; তা হয়ে উঠবে প্রজন্মান্তরে বহমান এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। নর্থ্যাম্পটনের দর্শকরা যেমন মঞ্চের ইতিহাস ঘরে নিয়ে গেছেন, তেমনই ভারতীয় থিয়েটারও হয়তো একদিন তার অতীতকে ভবিষ্যতের দর্শকের হাতে তুলে দেওয়ার সাহস দেখাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও হয়তো সেই জোর যোগাবে, যেখানে এই ধরণের প্রদর্শনী বা স্মারক বিক্রিকে মূল্যবান মনে করবে নাট্য দলেরা।
-অনুরূপা সেন