সংখ্যা - ১ ৪ ৮ ৫ তারিখ - ০ ৬ . ০ ৮ . ২ ০ ২ ৬ বর্ষ - ৩০
সংখ্যা - ১ ৪ ৮ ৫ তারিখ - ০ ৬ . ০ ৮ . ২ ০ ২ ৬ বর্ষ - ৩০
হওয়া না হওয়ার ‘ডাকঘর’: এক রবীন্দ্রনাটকের ইতিহাস
নাটকটা সকলেই চেনে। একজন অসুস্থ শিশু তার পিশেমশাইয়ের তত্ত্বাবধানে, কবিরাজের নির্দেশে একটা ঘরে বন্দী। অথচ সেই ঘরের জানলাই তাকে পৌঁছে দেয় অন্য এক দুনিয়ায়। ঘরের চার দেওয়াল তার কাছে আর বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। দইওয়ালা হোক বা সুধা, সকলের সঙ্গে ভাব জমে যায় ছোট্ট ছেলেটির। এতক্ষণে সকলেই বুঝে গেছেন নাটকের নাম। হ্যাঁ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘ডাকঘর’ নাটকের কথাই বলা হচ্ছে।
ডাকঘর নাটক হিসেবে কেন অনন্য, সেই কথা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু ডাকঘরের অভিনয়ের ইতিহাসও যে বিচিত্র এবং কম অভিনব নয়, তা আমরা অনেকসময়ই ভুলে যাই। কী প্রবল মানবিক আবেদনে এই লেখা যুগের পর যুগ ধরে ছুঁয়ে গেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষকে, বাংলা নাটকের ইতিহাসে সেই আখ্যান কম বরণীয় নয়।
আধুনিক বাংলা সাহিত্য বিভিন্ন প্রখ্যাত নাটককারের বিচরণক্ষেত্র হয়ে থেকেছে। কিন্তু যদি বলি ডাকঘর এমন এক নাটক, যা বাংলায় অভিনীত হওয়ার বেশ কিছু বছর আগেই ইংরাজিতে মঞ্চস্থ হয়েছিল সুদূর আয়ারল্যান্ডের এক প্রেক্ষাগৃহে, - তাহলে কিন্তু বেশ অবাক হতে হয়। সেই ইতিহাসের পিছনে কাণ্ডারী ছিলেন ডাব্লিউ বি. ইয়েটস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তির ইতিবৃত্তে যে ইয়েটস সাহেবের কথা আমরা বারবার আলোচনা করি, ডাকঘরের প্রথম অভিনয়ের কারিগরও তিনি। আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের অ্যাবি থিয়েটারে ১৯১৩ সালে মঞ্চস্থ হয় ডাকঘরের ইংরাজি অনুবাদ ‘দ্য পোস্ট অফিস’। অনুবাদ করেছিলেন অক্সফোর্ডের কৃতি ছাত্র দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। ইয়েটস এর সঙ্গে লেডি গ্রেগরিও ছিলেন এই নাট্যপ্রযোজনার বিশেষ সহযোগী। ওই বছরেই শেষের দিকে লন্ডনের কোর্ট থিয়েটারে অভিনীত হতে থাকে এই নাট্যের প্রযোজনা। এক বাংলা নাটক সাড়া ফেলে দেয় পশ্চিমি নাট্যচর্চার প্রাণকেন্দ্রে। পরের বছর দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদ বই আকারে প্রকাশিত হয় লন্ডনে। প্রথমে মাত্র ৪০০ কপি প্রকাশিত হয়েছিল সেই বই, ইয়েটস স্বয়ং লিখেছিলেন সেই বইয়ের ইংরাজি সংস্করণের ভূমিকা। ভুললে চলবে না, এই সেই বছর যখন ইংল্যান্ড সফর সেরে দেশে ফিরেছেন কবি এবং তারপরে নভেম্বর মাসে শান্তিনিকেতনে বসে তিনি জানতে পেরেছেন তাঁর নোবেলপ্রাপ্তির খবর।
তবে ডাকঘরের ৪০০ কপি দিয়ে ইউরোপের সাহিত্যমহলে আত্মপ্রকাশ তো কেবল এক অবিস্মরণীয় ইতিহাসের শুরুর কথা। শীঘ্রই ডাকঘর সাড়া ফেলে দেয় জার্মানীতেও। বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তখনও ইউরোপের দেশগুলি যুযুধান পক্ষে ভেঙে যায়নি। যদিও সবদিক থেকেই চাপা রাজনৈতিক উত্তেজনার উত্তাপ টের পাচ্ছে সব দেশই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই নাটক সেই সময় থেকেই ছড়িয়ে যেতে শুরু করে পশ্চিম ও পূর্ব ইউরোপের নানাপ্রান্তে। অবশ্য শুধু ডাকঘর নয়, সেইসঙ্গে কবির আরেক নাটক ‘রাজা’ও সমাদর পেতে শুরু করে ইউরোপের নানাপ্রান্তে।
বঙ্গদেশে ডাকঘরের প্রথম অভিনয় হয়েছিল অনেক পরে ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখন তার চূড়ান্ত পর্যায়ের বীভৎসতায় স্তব্ধ করে দিয়েছে পৃথিবীকে। পৃথিবীর সেই গভীরতর অসুখের দিনে রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে প্রথমবারের জন্য বাংলায় অভিনীত হয় ডাকঘর। কোনো মঞ্চে নয়, ‘বিচিত্রা’র দোতলার ঘরে। স্পেস-স্পেসিফিক থিয়েটারের রমরমা শুরু হওয়ার অনেক আগেই ডাকঘর অভিনয়ের জন্য একটা বাড়ির ঘরকে বেছে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই নাটকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথও। আর ছোট অমলের ভূমিকায় ছিল আশ্রমেরই ছাত্র আশামুকুল।
সত্যি সত্যিই সময় যত এগিয়েছে ডাকঘর কিন্তু আশার মুকুল হয়ে উঠেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। এক বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে যে নাটককে প্রথমবার আবিষ্কার করেছিল ইউরোপ, দ্বিতীয়বার বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার মুখোমুখি হয়ে সেই নাটকই হয়ে উঠল অসহায় মানুষের আশার ভাষ্য। তাই নাৎসি জার্মানীর সেনা যখন আক্রমণ করল ফ্রান্স, তখন ফরাসি সাহিত্যিক আঁদ্রে জিদ অনুবাদ করলেন ডাকঘর। সেই নাটক পড়া হল ১৯৪০ সালের জুন মাসে ফরাসি বেতারে। জিদ নিজেও পরবর্তীকালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন বিশ্বযুদ্ধ শেষের দুইবছর পর, ১৯৪৭ সালে।
আরো একজন নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক স্পেনীয় ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন ডাকঘর। জুয়ান র্যামোথ জিমেনেজ এর কলমে ডাকঘর ছড়িয়ে পড়েছিল স্পেনীয় পাঠকসমাজেও।
তবে এতো কেবল অনুবাদের ইতিহাস। বিশ্বযুদ্ধের দিনগুলোতে ডাকঘর অভিনয়ের ইতিহাস মর্মান্তিক অথচ চমকপ্রদ। লোকস্মৃতি অনুযায়ী জার্মানীর কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে বিষাক্ত গ্যাসের ধোঁয়ায় মৃত্যুর অপেক্ষা করতে করতে ডাকঘর অভিনয় করে নিজেদের সুস্থ রাখার চেষ্টা করতেন বন্দীরা। কেমন হতো সে অভিনয়, তার তথ্য সুলভ নয়। অনেক অভিনেতা হয়তো মারা গেছেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পেই। তবু যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাদের অনেকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল ডাকঘর। আর নাৎসি অধ্যুষিত পোল্যান্ডের ওয়ারশ ঘেটোতে তো ডাকঘরের অভিনয় হয়েছিল পোলিশ ভাষায়। যার তত্ত্বাবধানে ছিলেন পোলিশ ইহুদি জানুস কোরজাক। কোরজাক ছিলেন শিশুসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ। নাৎসি বাহিনীর হাতে তাঁর মৃত্যু হয় ত্রেব্লিঙ্কা কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে। তবুও অমল নামে এক শিশুর গল্প বাঁচিয়ে রেখেছিল তার নিশ্চিত মৃত্যুপথযাত্রী জীবনকে। অনেকটা জীবনী শক্তি ঢেলে দিলেও একটা নাটক সবসময় জীবনদাতা তো হয়ে উঠতে পারে না। ডাকঘরের সেসব অভিনয়ের অনেক মুখই তাই আর কখনো বেরোতে পারেননি কনসেনট্রেশান ক্যাম্পের অন্ধকারের বাইরে।
ডাকঘরের ইতিহাস আসলে বিচিত্র, বহুমুখী। সভ্যতার ইতিহাসের মতোই সেখানে প্রসারের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গেই লেগে থাকে বিয়োগের বেদনা। আর সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন একজন মানুষ, যাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ। শুধু ভারতীয় বা বাঙালিকে নয়। তীব্র গাঢ় অন্ধকারেও তাঁর নাটক মানুষকে অপেক্ষা করতে শিখিয়েছে এক অলৌকিক রাজার চিঠির জন্য। ২২ শ্রাবণ আসন্ন আবারও। আকাশ কালো করে বর্ষণও অবিরাম৷ সেই ধারা শুদ্ধ করবে ধরণী। রাজকবিরাজ ঠিক আসবেন কোনো এক সময়ে, তারপর সব অসুখ সারবে, সেই অপেক্ষায় আমরাও কি বসে নেই আজ এই উত্তর আধুনিক এ.আই সর্বস্ব একুশ শতকীয় পৃথিবীতে?
-সৌরদীপ মুখোপাধ্যায়