সংখ্যা - ১ ৪ ৮ ৫ তারিখ - ০ ৬ . ০ ৮ . ২ ০ ২ ৬ বর্ষ - ৩০
সংখ্যা - ১ ৪ ৮ ৫ তারিখ - ০ ৬ . ০ ৮ . ২ ০ ২ ৬ বর্ষ - ৩০
মঞ্চের স্মৃতি যখন দর্শকের ঘরে: নর্থ্যাম্পটনের উদ্যোগ কি ভারতীয় থিয়েটারের জন্য নতুন দিশা?
নাটক শেষ হয়ে যায় পর্দা নামার সঙ্গে সঙ্গে—এ কথা আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু সত্যিই কি একটি নাটকের জীবন সেদিনই শেষ হয়? মঞ্চে ব্যবহৃত একটি চেয়ার, একটি কস্টিউম, একটি মুখোশ, কিংবা অভিনেতার হাতে ধরা একটি ছড়ি—এসব কি শুধুই বস্তু? নাকি এগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকে একেকটি প্রযোজনার ইতিহাস, শিল্পীদের শ্রম, দর্শকের আবেগ এবং একটি সময়ের সাংস্কৃতিক স্মৃতি? ব্রিটেনের নর্থ্যাম্পটনের রয়্যাল এন্ড ডার্নগেট থিয়েটার সম্প্রতি এই প্রশ্নগুলির এক বাস্তব উত্তর তুলে ধরেছে এক অভিনব উদ্যোগের মাধ্যমে। তাদের আয়োজিত 'বিগ থিয়েটার সেল'-এ দর্শকদের জন্য বিক্রি করা হয় বহু প্রযোজনায় ব্যবহৃত আসল কস্টিউম, প্রপস, আসবাব, সেটের উপকরণ, পোস্টার এবং অন্যান্য নাট্যসামগ্রী। মুহূর্তের মধ্যেই অনুষ্ঠানটি শুধুমাত্র একটি বিক্রয় মেলা না থেকে রূপ নেয় নাট্যঐতিহ্যকে ঘিরে এক আবেগঘন উৎসবে।
দুই দিনের এই বিক্রয় অনুষ্ঠানে নাট্যপ্রেমীদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই সকাল থেকেই লাইনে দাঁড়ান, কারণ তাঁদের কাছে এই সামগ্রীগুলির বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এর স্মৃতিমূল্য। যে পোশাক একসময় আলো ঝলমলে মঞ্চে কোনও বিখ্যাত চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলেছিল, অথবা যে টেবিলকে কেন্দ্র করে নাটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যটি অভিনীত হয়েছিল, সেই জিনিস নিজের ঘরে নিয়ে যাওয়ার অনুভূতি যে কোনও থিয়েটারপ্রেমীর কাছে এক বিরল অভিজ্ঞতা। এ যেন একটি নাটকের ইতিহাসের ছোট্ট অংশকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের অংশ করে নেওয়া।
এই উদ্যোগের তাৎপর্য আরও গভীর, কারণ রয়্যাল এন্ড ডার্নগেট কোনও সাধারণ নাট্যগৃহ নয়। ১৮৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক রয়্যাল থিয়েটার এবং পরবর্তীকালে নির্মিত ডার্নগেট থিয়েটারকে মিলিয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান আজ ব্রিটেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক থিয়েটার। এখানে যেমন নতুন নাটক প্রযোজনা হয়, তেমনি রয়েছে সমৃদ্ধ আর্কাইভ, যেখানে সংরক্ষিত থাকে বিভিন্ন প্রযোজনার দলিল, পোস্টার, পোশাক এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন। বহু বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র নাটক মঞ্চস্থ করেই থেমে থাকেনি; বরং নাট্যঐতিহ্য সংরক্ষণকেও নিজেদের দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে থিয়েটারকে শুধু একটি পরিবেশনা হিসেবে নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা বাড়ছে। দর্শককে শুধুমাত্র টিকিট কিনে নাটক দেখার সুযোগ দেওয়া নয়, বরং নাটকের ইতিহাস, নির্মাণপ্রক্রিয়া এবং মঞ্চের অন্দরমহলের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। নর্থ্যাম্পটনের এই উদ্যোগ সেই ধারারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ব্যবহৃত প্রপস বা পোশাক বিক্রির মাধ্যমে একদিকে যেমন থিয়েটারের অতিরিক্ত আয় হয়, অন্যদিকে দর্শকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কও আরও গভীর হয়। একটি নাটক শেষ হওয়ার পরেও তার স্মৃতি নতুন রূপে বেঁচে থাকে দর্শকের ঘরে।
ভারতের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের দেশে, বিশেষত বাংলা গ্রুপ থিয়েটারে, প্রযোজনার পর ব্যবহৃত সেট, প্রপস, কস্টিউম কিংবা পোস্টারের ভবিষ্যৎ খুব কম ক্ষেত্রেই পরিকল্পিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থানাভাব, অর্থাভাব অথবা সংরক্ষণের অভাবে সেগুলি নষ্ট হয়ে যায় বা হারিয়ে যায়। অথচ এগুলিই ভবিষ্যতের নাট্যগবেষণার মূল্যবান উপাদান হতে পারত। একটি প্রজন্মের শিল্পচর্চার সাক্ষ্য হিসেবে এগুলির গুরুত্ব অপরিসীম।
বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে নানা নাট্যদলের অসংখ্য ঐতিহাসিক প্রযোজনা রয়েছে। সেইসব প্রযোজনার পোশাক, আলোক পরিকল্পনার স্কেচ, হাতে আঁকা সেট ডিজাইন, পোস্টার কিংবা প্রপস যদি আজ সুসংগঠিতভাবে সংরক্ষিত থাকত, তবে তা শুধু গবেষকদের জন্য নয়, সাধারণ দর্শকের কাছেও এক অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠত। অনেক দেশের মতো ভারতে নাট্যসংগ্রহশালা, চলমান প্রদর্শনী কিংবা প্রযোজনা-পরবর্তী স্মারক বিক্রির সংস্কৃতি এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
অবশ্য ব্যতিক্রমও রয়েছে। ভারতের কিছু জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যেমন জাতীয় নাট্য বিদ্যালয় বা কয়েকটি বড় সাংস্কৃতিক সংস্থা সীমিত পরিসরে আর্কাইভ সংরক্ষণের কাজ করে। কিন্তু রাজ্যভিত্তিক গ্রুপ থিয়েটারের বিশাল ভাণ্ডারের তুলনায় এই প্রচেষ্টা এখনও অপর্যাপ্ত। বিশেষ করে বাংলা থিয়েটারের মতো সমৃদ্ধ ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও কোনও কেন্দ্রীভূত নাট্য-আর্কাইভ বা দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত সংগ্রহশালার অভাব স্পষ্ট।
নর্থ্যাম্পটনের উদ্যোগ ভারতীয় থিয়েটারের কাছে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। মঞ্চসামগ্রীকে শুধুমাত্র ব্যবহারযোগ্য বস্তু হিসেবে না দেখে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে মূল্যায়ন করা জরুরি। নাটকের নির্দিষ্ট বার্ষিকী উপলক্ষে পুরনো কস্টিউম ও প্রপস প্রদর্শনী, সীমিত সংস্করণের স্মারক বিক্রি, পোস্টার পুনর্মুদ্রণ, অথবা ব্যবহৃত প্রপসের নিলাম—এই ধরনের উদ্যোগ দর্শকের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। পাশাপাশি এগুলি নাট্যদলের জন্য একটি বিকল্প আয়ের উৎসও হতে পারে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
আজ যখন ভারতীয় থিয়েটার ডিজিটাল মাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে এবং নতুন দর্শক আকর্ষণের নানা পথ খুঁজছে, তখন নর্থ্যাম্পটনের এই উদ্যোগ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। থিয়েটারের শক্তি কেবল মঞ্চে নয়, তার স্মৃতিতেও। সেই স্মৃতিকে যদি সযত্নে সংরক্ষণ করে দর্শকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়, তবে নাটক আর কয়েক ঘণ্টার একটি পরিবেশনা হয়ে থাকবে না; তা হয়ে উঠবে প্রজন্মান্তরে বহমান এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। নর্থ্যাম্পটনের দর্শকরা যেমন মঞ্চের ইতিহাস ঘরে নিয়ে গেছেন, তেমনই ভারতীয় থিয়েটারও হয়তো একদিন তার অতীতকে ভবিষ্যতের দর্শকের হাতে তুলে দেওয়ার সাহস দেখাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও হয়তো সেই জোর যোগাবে, যেখানে এই ধরণের প্রদর্শনী বা স্মারক বিক্রিকে মূল্যবান মনে করবে নাট্য দলেরা।
-অনুরূপা সেন