সংখ্যা - ১৪৯২ তারিখ - ২৪.০৯.২৬ বর্ষ - ৩০
সংখ্যা - ১৪৯২ তারিখ - ২৪.০৯.২৬ বর্ষ - ৩০
প্রকৃতি ও থিয়েটার: সম্পর্কের প্রকরণ
প্রকৃতির সঙ্গে থিয়েটারের সম্পর্কটা আসলে ঠিক কী বা কেমন? দর্শনশাস্ত্রে এই নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। দর্শনের ধারায় সেমিওটিক্সের আলোচনায় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে এই প্রসঙ্গ। কিন্তু সত্যিই যে থিয়েটার আমরা দেখি তার সঙ্গে প্রকৃতির যোগাযোগ ঠিক কতটা - সেইটা ভেবে দেখবার বিষয় বইকি!
সাম্প্রতিককালে স্টিভেন সি. হ্যামেল দেখিয়েছেন যে শিল্পের মৌলিক অবস্থানের মধ্যেই দুটো পর্যায় রয়েছে। প্রথমত সে অবশ্যই বৃহত্তর প্রকৃতির অংশ এবং দ্বিতীয়ত সে কখনোই প্রকৃতির হুবহু প্রতিচ্ছবি নয়। ফলত শিল্প এবং প্রকৃতির সম্পর্ক আসলে এক গভীর দার্শনিক সমস্যাও বটে।
আসলে থিয়েটার কেন - এই প্রশ্ন নিয়ে নিরন্তর চর্চা করেছেন নৃতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক থেকে শুরু করে সমাজতাত্ত্বিক, দার্শনিক সকলেই। কিন্তু প্রকৃতি ও থিয়েটারের সম্পর্ককে বুঝতে হলে থিয়েটার কখন এবং কীভাবে এই প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজা শুরু করতে হয়।
থিয়েটারের প্রাগিতিহাস খুঁজতে গিয়ে ভিক্টর টার্নার বা রিচার্ড শেখনারের মতো তাত্ত্বিকরা বারবারই ফিরে গেছেন প্রাগৈতিহাসিক সমাজের রিচুয়াল বা উপাচার কেন্দ্রিক সামাজিক আচরণের। কিন্তু রিচুয়ালের মতো এক বিশেষ সামাজিক পারফরম্যান্সই বা জন্ম নেয় কখন? এই প্রসঙ্গে প্রখ্যাত নৃতাত্ত্বিক ব্রোনিশ্ল ম্যালিনওস্কির বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা যায় যে - রিচুয়াল আসলে মানবমস্তিষ্কের এক বিশেষ উদ্ভাবন যা যেকোনো রকম ব্যাখ্যাহীন সংকটের সামনে মানবিক উদ্বেগের প্রকাশ হিসেবে উদ্ভূত হয়। অর্থাৎ আদিম সমাজে মানুষ যখন জানত না কেন বন্যা বা খরায় একেক বছর হঠাৎই ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তখন সেই সংকটের সামনে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে, তার থেকে রক্ষা পেতে তারা তৈরি করেছিল এক বিশেষ আচরণ। সেই আচরণই রিচুয়াল বা উপাচার। তবে কি থিয়েটারের উদ্ভবের বীজ নিহিত রয়েছে প্রাকৃতিক সংকটের গভীরে?
ভিক্টর টার্নারের কথাও এই প্রসঙ্গে অবশ্যই আলোচনায় আনতে হয়। টার্নার দেখিয়েছেন যে রিচুয়ালের মতোপারফরম্যান্সের হাত ধরেই মানুষ সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে যে তত্ত্বকে আরো বড় করে নিয়ে বলা হয় যে আসলে যারা একসঙ্গে কোনো একটা পারফরম্যান্সে যুক্ত হয়, তারাই নিজেদের মধ্যে একটা আত্মীয়তার বন্ধন অনুভব করে। পারিবারিক রক্তের সম্পর্কের বাইরে আমাদের যে বৃহত্তর আত্মিক টান, সে জাতিচেতনাই হোক, বা দল বা গোষ্ঠীচেতনা: তার গোড়ায় রয়েছে বিভিন্ন রকম পারফরম্যান্স।
তাহলে এত আলোচনার পরে যদি ধরে নেওয়া যায় যে: প্রথমত থিয়েটার বা পারফরম্যান্সের সূচনা হয়েছে রিচুয়ালের গহ্বরে ও রিচুয়াল প্রাকৃতিক সংকটের সামনে এক মানবিক আচরণ এবং দ্বিতীয়ত, রিচুয়াল পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই সমাজ বা এইজাতীয় ছোটবড় গোষ্ঠী তৈরি হয়, তাহলে প্রশ্ন জন্মায় - থিয়েটার আর প্রকৃতি কি আসলে দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে দাঁড়িয়ে আছে?
একটা বুলি আমরা অনেকসময়ই খুবই কপচে থাকি - ‘থিয়েটার সমাজ বদলের হাতিয়ার’। কিন্তু যদি এইবার কথাটাকে একটু ফিরে দেখি, তাহলে কি এরকম দাবি করা যায় যে - আমাদের চারপাশের যে প্রকৃতি, যা মানুষ তার সামাজিক উপস্থিতি ও কার্যকলাপ দিয়ে ক্রমশ এক অতি জটিল পরিবেশে রূপান্তরিত করেছে - সেই ‘সামাজিক প্রকৃতি’র যাবতীয় সংকটের প্রতিক্রিয়াতেই আমাদের থিয়েটার আজও জন্মায়, বড় হয়, আবার সেই প্রকৃতি বদলে গেলে থিয়েটারও নিজেকে বদলে নেয়: অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় তার পূর্বতন ভাষ্য?
এইখানে দাঁড়িয়ে আমাদের নতুন করে ভেবে দেখা দরকার থিয়েটার ও সেমিওটিক্সের সম্পর্কের সমীকরণকেও। হ্যামেল সাহেব যেরকম শিল্পের অবস্থানের দুটো স্তর খুঁজে পেয়েছেন, তা মাথায় রেখেই প্রশ্ন তোলা দরকার যে থিয়েটার যদি প্রকৃতির অংশও হয়, তা ফর্মে বা প্রকাশের ভঙ্গিতে কতদূর এই প্রকৃতির অনুকৃতি? নাকি যাবতীয় থিয়েটারি সেমিওটিক্স আসলে এক প্রতিক্রিয়ামূলক উদ্ভাবন? প্রাকৃতিক উপাদানের শিল্পিত উপস্থিতি কি সেখানে প্রকৃতির আঘাতকে মোকাবিলা করার হাতিয়ার? মানুষ কি নিজের কিয়ৎ অজান্তেই থিয়েটারে তার পারিপার্শ্বিক প্রকৃতিকে এমনভাবে হাজির করতে চায়, যা তাকে প্রকৃতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতীত করে? আসলে থিয়েটার নামক শিল্পের মধ্যে কি রয়েছে সেই মৌলিক মানবিক আবেদন - যা আর সবকিছুর মতোই প্রকৃতিকেও করায়ত্ত করে রাখতে চায়, - বহুলাংশে তা নিয়ন্ত্রণহীন জেনেই? থিয়েটার আর প্রকৃতির প্রাকৃতিক সম্পর্কের মধ্যে লুকিয়ে থাকা দ্বান্দ্বিকতা আমাদের সামনে থিয়েটারের আরো অযুত সম্ভাবনার পথ খুলে দিতে পারে।
-সৌরদীপ মুখোপাধ্যায়