সংখ্যা - ১৪৯২ তারিখ - ২৪.০৯.২৬ বর্ষ - ৩০
সংখ্যা - ১৪৯২ তারিখ - ২৪.০৯.২৬ বর্ষ - ৩০
কার্টেন কলে ছবি তোলার প্রতিবাদে কেট ব্ল্যানচেট
থিয়েটারের অন্ধকারে হঠাৎ জ্বলে উঠল একটি মোবাইলের পর্দা। মঞ্চে তখন অভিনয় চলছে। দর্শকের চোখ যেমন সেই আলোয় আটকে যেতে পারে, তেমনই অভিনেতারও। কিন্তু সমস্যাটি শুধু কয়েক সেকেন্ডের একটি আলো নয়। মোবাইলের ক্যামেরা যখন মঞ্চের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন দর্শক আর কেবল দর্শক থাকেন না—তিনি হয়ে ওঠেন একজন রেকর্ডার। আর সেই জায়গাতেই সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্ন উঠছে, লাইভ থিয়েটারের অভিজ্ঞতা কি ধীরে ধীরে সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য তৈরি একটি ছোট ভিডিওতে পরিণত হচ্ছে?
লন্ডনের ন্যাশনাল থিয়েটার-এ সম্প্রতি সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনে দিলেন অভিনেত্রী কেট ব্ল্যানচেট।
বেনেডিক্ট অ্যান্ড্রিউজ পরিচালিত ইলেক্ট্রা/পার্সোনা নাটকে অভিনয় করছেন কেট ব্ল্যানচেট এবং নিনা হোস। সফোক্লেস-এর ইলেক্ট্রা এবং ইংমার বার্গম্যান-এর পার্সোনা-কে মিলিয়ে তৈরি এই প্রযোজনা নিজেই দর্শক-অভিনেতার সম্পর্ক নিয়ে খেলে। প্রতিটি শোয়ের শুরুতেই দর্শকদের একজনকে কয়েন ছুড়তে বলা হয়; সেই ফলের উপর নির্ভর করে ঠিক হয় দুই অভিনেত্রীর কে কোন চরিত্রে অভিনয় করবেন। অর্থাৎ এখানে দর্শক শুরু থেকেই নাটকের একটি অংশ।
কিন্তু দর্শকের অংশগ্রহণ আর দর্শকের মোবাইল ক্যামেরা—দুটিকে এক করে দেখছেন না ব্ল্যানচেট।
একটি সাম্প্রতিক প্রদর্শনের শেষে কার্টেন কল-এর পর আবার মঞ্চে ফিরে আসেন তিনি। দর্শকদের উদ্দেশে তাঁর বক্তব্য ছিল মূলত একটি অনুরোধ: কার্টেন কল-এর ছবি বা ভিডিও তোলার বিষয়টি তিনি কিছুটা বুঝতে পারেন, এমনকি সেটিকে অভিনন্দন হিসেবেও নিতে পারেন; কিন্তু অভিনয় চলাকালীন কেউ যেন পুরো শো রেকর্ড না করেন। কারণ সেই রেকর্ডিং পরবর্তী দর্শকের অভিজ্ঞতা নষ্ট করে দিতে পারে।
বক্তব্যটির তাৎপর্য এখানেই যে, ব্ল্যানচেট শুধু নিজের অভিনয়ের স্বার্থে আপত্তি জানাননি। তাঁর যুক্তির কেন্দ্রে ছিল পরবর্তী দর্শক।
থিয়েটার মূলত একটি ‘এখন’-এর শিল্প। একই নাটক পরপর একশো রাত মঞ্চস্থ হলেও প্রতিটি প্রদর্শন পুরোপুরি একই হয় না। অভিনেতার শরীর, কণ্ঠ, দর্শকের প্রতিক্রিয়া, হলের আবহ, কোনও সংলাপের পর বিরতির দৈর্ঘ্য—সব মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে তৈরি হয় একটি নির্দিষ্ট পারফরমেন্স। সেই মুহূর্তের একটি অংশ ভিডিও করে বাইরে নিয়ে গেলে সেটি আর সেই মুহূর্ত থাকে না।
আর এখানেই থিয়েটারের সঙ্গে সিনেমা বা টেলিভিশনের মৌলিক পার্থক্য।
সিনেমা তৈরি হয় ক্যামেরার জন্য। তার প্রতিটি ফ্রেম পরিকল্পিত। দর্শক পর্দায় যা দেখবেন, সেটি পরিচালক ও সম্পাদকের সিদ্ধান্তের ফল। কিন্তু থিয়েটারে দর্শক একই ঘরে বসে অভিনেতার সঙ্গে একটি শারীরিক পরিসর ভাগ করে নেন। অভিনেতা জানেন যে কয়েক মিটার দূরে মানুষ বসে তাঁর অভিনয় দেখছেন। দর্শকের হাসি, নীরবতা, অস্বস্তি, কাশির শব্দ—সবই কখনও না কখনও পারফরমেন্স-এর রিদিম-কে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই মঞ্চে একটি মোবাইল ক্যামেরা কেবল একটি ব্যক্তিগত যন্ত্র নয়; সেটি সেই শেয়ার্ড স্পেস-এর অংশ হয়ে যায়।
এই সমস্যা অবশ্য নতুন নয়। কিন্তু স্মার্টফোনের ক্যামেরা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তারের সঙ্গে বিষয়টি অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। এখন দর্শকের কাছে একটি সম্পূর্ণ দৃশ্য রেকর্ড করা এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে তা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা অত্যন্ত সহজ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর একটি নতুন প্রযুক্তি—স্মার্ট গ্লাসেস। দেখতে সাধারণ চশমার মতো হলেও এই ধরনের ডিভাইস দিয়ে ছবি বা ভিডিও রেকর্ড করা সম্ভব। ফলে ভবিষ্যতে দর্শক রেকর্ড করছেন কি না, সেটিও মঞ্চের অভিনেতার পক্ষে সবসময় বোঝা সম্ভব নাও হতে পারে।
ব্রিটেনের অভিনয়শিল্পীদের সংগঠন ইকুইটি এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির বক্তব্য, শিল্পীদের কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে এবং তাঁদের সম্মতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ধারণ করা সেই পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে দর্শকেরও অধিকার রয়েছে বাধাহীনভাবে একটি উচ্চমানের থিয়েট্রিকাল অভিজ্ঞতা পাওয়ার।
অর্থাৎ এটি শুধুমাত্র ‘মোবাইল ব্যবহার করা উচিত কি উচিত নয়’—এই সাধারণ এটিকেট-এর প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শিল্পীর কাজের পরিবেশ, দর্শকের অভিজ্ঞতা এবং পারফরমেন্স-এর অধিকার।
এই কারণে কেট ব্ল্যানচেটের বক্তব্যকে সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনার ধারাবাহিকতায় দেখতে হচ্ছে।
এই বছরের শুরুতে লিগালি ব্লন্ড মিউজিক্যাল-এর একটি ভ্রাম্যমান প্রযোজনায় অভিনেত্রী অ্যাম্বার ডেভিস প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছিলেন এক দর্শকের বিরুদ্ধে। তাঁর অভিযোগ ছিল, সামনের সারিতে বসা একজন দর্শক প্রথম অঙ্কের প্রায় পুরোটা সময় ফোনে রেকর্ড করছিলেন। ডেভিস-এর মতে, বিষয়টি অভিনেতাদেরও ডিস্ট্র্যাক্ট করছিল এবং অভিনেতাদের কাজের উপর প্রভাব ফেলেছিল।
এর আগে আরেক অভিনেত্রী রোজামন্ড্ পাইক-ও মঞ্চে দর্শকের ফোন ব্যবহারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। ইন্টার আলিয়া নাটকে অভিনয়ের সময় একজন দর্শক গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃশ্যে মেসেজ করছিলেন। পাইক পরে মঞ্চে ফিরে এসে জানান, সেই ঘটনা অভিনেতা এবং দর্শকের মধ্যে তৈরি হওয়া ইমোশনাল কানেকশন-কে ভেঙে দিয়েছিল।
অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু রেকর্ডিং নয়। ফোনের আলো, মেসেজ লেখা, নোটিফিকেশন—সবই এখন থিয়েটার এটিকেট-এর আলোচনায় ঢুকে পড়েছে।
প্রশ্ন হল, দর্শক কেন রেকর্ড করেন?
কারও কাছে এটি স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা। কারও কাছে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করার আকাঙ্ক্ষা। আবার কারও কাছে প্রিয় অভিনেতাকে কাছ থেকে দেখার উত্তেজনা। বিশেষ করে সেলিব্রিটি যুক্ত প্রদক্ষনগুলোতে এই প্রবণতা আরও বেশি হতে পারে। কেট ব্ল্যানচেটের মতো আন্তর্জাতিক তারকা মঞ্চে থাকলে দর্শকের একটি অংশ হয়তো নাটকটা উপভোগ করার পাশাপাশি ‘আমি সেখানে ছিলাম’—এই প্রমাণটিও ধরে রাখতে চান।
কিন্তু এখানেই থিয়েটারের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া কালচারের সংঘাত।
সামাজিক মাধ্যম চায় মুহূর্তটিকে সঙ্গে সঙ্গে ধরে রাখতে। থিয়েটার চায় মুহূর্তটির মধ্যে থাকতে।
ব্ল্যানচেটের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্ভবত তাঁর সেই মন্তব্য—পৃথিবীতে খুব বেশি জায়গা নেই যেখানে মানুষ সত্যিই একসঙ্গে থাকতে এবং উপস্থিত থাকতে পারে।
এই ‘প্রেসেন্স’-এর ধারণাটিই থিয়েটারের মূল শক্তি।
দর্শক যখন অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে মঞ্চের দিকে তাকান, তখন তাঁকে কোনও এলগরিদম নিয়ন্ত্রণ করছে না। তাঁর সামনে একটি নির্দিষ্ট মানুষ, নির্দিষ্ট সময় এবং নির্দিষ্ট জায়গায় অভিনয় করছেন। নাটক শেষ হয়ে গেলে সেটি শেষ। আবার দেখা যেতে পারে, কিন্তু একইভাবে ফিরে পাওয়া যায় না।
তাই থিয়েটারে ‘এখন’ থাকা আসলে একটি সাংস্কৃতিক অভ্যাসও।
ব্রিটেনের কিছু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই 'দর্শকদের আচরণ' নিয়ে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এডিনবর আন্তর্জাতিক উৎসব-এর নির্দেশক নিকোলা বেনডেটটি সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রযোজনায়-এ গিয়ে দর্শকদের ফোন কীভাবে বন্ধ করতে হয়, সে বিষয়ে সরাসরি সচেতন করেছেন।
তবে সমস্যার আর একটি দিকও রয়েছে—নিয়ম প্রয়োগ করা।
কোনও দর্শক ফোনে রেকর্ড করছেন দেখলে আসার বা প্রেক্ষাগৃহের কর্মীকে তাঁকে থামাতে হয়। কিন্তু তার জন্য কখনও কখনও নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে। এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, প্রেক্ষাগৃহ কর্মীদের বড় একটি অংশ আগের বছরে দর্শকদের অসামাজিক আচরণ, রাগ বা হ্যারাসমেন্ট-এর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে নিয়ম প্রয়োগ করাও সবসময় সহজ নয়।
এই জায়গায় কেট ব্ল্যানচেটের পদ্ধতিটি আলাদা। তিনি শো থামিয়ে কাউকে প্রকাশ্যে অপমান করেননি। কার্টেন কল-এর পরে মঞ্চে ফিরে এসে সমস্ত দর্শকদের উদ্দেশে কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল দৃঢ়, কিন্তু মূল সুর ছিল অনুরোধের। দর্শকরাও তাঁকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানিয়েছেন।
ঘটনাটি তাই একটি বৃহত্তর প্রশ্ন রেখে যায়—থিয়েটারে দর্শকের স্বাধীনতার সীমা কোথায়?
দর্শক টিকিট কিনেছেন, অর্থ দিয়েছেন, নাটক দেখতে এসেছেন। কিন্তু টিকিট কেনার অর্থ কি অভিনয় চলাকালীন রেকর্ড করার অধিকারও কিনে নেওয়া? একজন দর্শকের তৈরি ভিডিও যদি পরের দর্শকের নাটক দেখার অভিজ্ঞতা নষ্ট করে, তাহলে সেই ব্যক্তিগত অধিকার কোথায় গিয়ে কালেক্টিভ এক্সপিরিয়েন্স-এর সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে?
থিয়েটারের ক্ষেত্রে উত্তরটি হয়তো খুব সরল—দর্শক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তিনি একা নন।
একটি পারফরমেন্স তৈরি হয় অভিনেতা, পরিচালক, আলো, শব্দ, মঞ্চকর্মী, ডিজাইনার এবং দর্শক—সবাইকে নিয়ে। সেই মুহূর্তটি কারও একার নয়। তাই সেটিকে উপভোগ করার স্বাধীনতার সঙ্গে অন্যদের সেই অভিজ্ঞতা পাওয়ার অধিকারও জড়িয়ে থাকে।
কেট ব্ল্যানচেটের বক্তব্য সেই পুরনো থিয়েটার-নীতিটিকেই নতুন প্রযুক্তির ভাষায় মনে করিয়ে দিল—মঞ্চে যা ঘটছে, সেটি শুধু দেখার নয়; উপস্থিত থেকে অনুভব করারও বিষয়।
আর হয়তো সেই কারণেই, প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকারে পরের বার ফোনের স্ক্রিন জ্বালানোর আগে দর্শকের একবার ভাবা উচিত—স্মৃতিটা কি সত্যিই ফোনে ধরে রাখা দরকার, নাকি সেটিকে সেই রাতের, সেই প্রেক্ষাগৃহের, সেই কয়েকশো মানুষের যৌথ স্মৃতি হিসেবেই রেখে দেওয়া যায়?
কারণ লাইভ থিয়েটারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হল—সেটি আবার ঠিক সেইভাবে কখনও ঘটবে না।
-অনুরূপা সেন