সংখ্যা - ১৪৯২ তারিখ - ২৪.০৯.২৬ বর্ষ - ৩০
সংখ্যা - ১৪৯২ তারিখ - ২৪.০৯.২৬ বর্ষ - ৩০
স্কুলের মঞ্চে ‘নমো গাথা’, শেষে পড়ুয়াদের মুখে ‘জয় শ্রীরাম’—বিতর্ক তুঙ্গে
প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসনিক জীবনের ২৫ বছর ঘিরে ‘নমো সেবা: অজানা কাহিনি’; শিক্ষা দফতরের পাঠানো চিত্রনাট্যেই ধর্মীয় স্লোগানের সংযোজন নিয়ে প্রশ্ন
স্কুলের মঞ্চে নাটক। সামনে দর্শকও স্কুলপড়ুয়ারাই। আর সেই নাটকের শেষ দৃশ্যে দর্শকদের দিয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়ানোর নির্দেশ রয়েছে চিত্রনাট্যে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রশাসনিক জীবনের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজ্যের স্কুলগুলিতে মঞ্চস্থ হওয়া ‘নমো সেবা: অজানা কাহিনি’ ঘিরে এবার এই অভিযোগ সামনে আসায় বিতর্ক আরও তীব্র হল। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষামহলের একাংশ প্রশ্ন তুলেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এ ধরনের স্লোগান কতটা গ্রহণযোগ্য।
‘সেবা সংকল্প অভিযান’-এর অঙ্গ হিসেবে ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত স্কুল ও অন্যান্য নির্দিষ্ট জায়গায় ‘নমো সেবা গাথা’ নামে সঙ্গীত-নাট্য পরিবেশনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। স্কুলশিক্ষা দফতরের ৮ সেপ্টেম্বরের নির্দেশিকায় জনসেবা, জনকল্যাণমূলক কাজ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের নাটক আয়োজনের কথা বলা হয়। পরে বিভিন্ন জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শকের মাধ্যমে নির্বাচিত স্কুলগুলিতে ‘নমো সেবা—অজানা কাহিনি’র চিত্রনাট্য পৌঁছয়।
সেই নাটকের বিষয়বস্তুতে নরেন্দ্র মোদীর মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গত ২৫ বছরের প্রশাসনিক পর্বের নানা ঘটনা এবং সরকারি প্রকল্পের উল্লেখ রয়েছে। ২০০১-এর গুজরাট ভূমিকম্প থেকে গুজরাটের পুনর্গঠন, জ্যোতিগ্রাম যোজনা, নর্মদার জল, ‘ভাইব্র্যান্ট গুজরাট’, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, কোভিডকালে টিকাকরণ, ‘অপারেশন গঙ্গা’, ৩৭০ ধারা বাতিল, ইউপিআই, জনধন, মেট্রো, সৌরশক্তি, রামমন্দির, স্ট্যাচু অব ইউনিটি এবং কর্তব্য পথ—একাধিক প্রসঙ্গ নাটকের কাহিনিতে এসেছে।
কিন্তু বিতর্কের কেন্দ্রে এখন নাটকের শেষ অংশটি। চিত্রনাট্য অনুযায়ী, ‘দিশা’ নামে একটি চরিত্র রামমন্দির প্রসঙ্গে দর্শকদের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলে—দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে রামলালার মন্দির কে নির্মাণ করেছেন? এরপর দর্শকদের কাছ থেকে ‘মোদীজি’ উত্তর আসার কথা। তার পরেই ওই চরিত্র দর্শকদের একসঙ্গে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে আহ্বান করে। চিত্রনাট্যের বিন্যাস অনুযায়ী, দর্শকাসনে থাকা পড়ুয়াদেরও সেই স্লোগান পুনরাবৃত্তি করার কথা। বুধবার বিভিন্ন স্কুলে নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পর এই অংশটি নিয়েই আপত্তি সামনে এসেছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের দিয়ে কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরা নিয়েও ইতিমধ্যে শিক্ষক মহলের একাংশ প্রশ্ন তুলেছে। তাঁদের বক্তব্য, নাটকের মাধ্যমে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান পড়ুয়াদের সামনে তুলে ধরার সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষ পরিবেশের প্রশ্ন জড়িত। পশ্চিমবঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিও ‘নমো সেবা গাথা’ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
শুধু স্কুল নয়, কলেজগুলিতেও ‘নমো সেবা’ নাটক মঞ্চস্থ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১ থেকে ৭ অক্টোবরের মধ্যে কলেজগুলিতে নাটক করার কথা এবং কোথাও এনএসএস, কোথাও নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত পড়ুয়াদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানা গিয়েছে। কলেজের নাটকে নরেন্দ্র মোদীর চরিত্রে একজন পড়ুয়ার অভিনয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
ফলে ‘নমো সেবা গাথা’কে ঘিরে বিতর্ক এখন শুধু একটি সরকারি কর্মসূচি বা নাটকের বিষয়বস্তুতে সীমাবদ্ধ নেই। স্কুল-কলেজের মঞ্চে পড়ুয়াদের কী ধরনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বক্তব্য উচ্চারণ করানো হচ্ছে, সেই প্রশ্নই সামনে চলে এসেছে।
-তুফান সিংহরায়